প্রেমের বাঁধন যে দেশ, ভাষা কিংবা সংস্কৃতির সীমানা মানে না—তার জীবন্ত প্রমাণ হয়ে উঠেছেন চীনের জিয়াংসু প্রদেশের তরুণ ইয়ং সং সং (২৬)। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের কাজিপাড়া শিমুলতলায় বসবাসরত তরুণী সুরভী আক্তারের (১৯) প্রেমে পড়ে তিনি হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। বর্তমানে গ্রামজুড়ে চলছে তাদের বিয়ের প্রস্তুতি, আর উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে স্থানীয় পরিবেশ।
অনলাইনে শুরু, বাস্তবে মিলন
প্রায় এক বছর আগে ‘হ্যালো ট্যাক’ নামের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয় ইয়ং সং সং ও সুরভীর। প্রথমে সাধারণ আলাপচারিতা, তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, আর সেখান থেকে জন্ম নেয় গভীর ভালোবাসা। সময়ের ব্যবধানে তারা একে অপরের জীবন সম্পর্কে জানতে থাকেন, শেয়ার করতে থাকেন ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ।
সুরভীর ভাষায়,
“প্রথমে ভাবিনি এভাবে সম্পর্ক এগোবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারি, আমাদের মধ্যে বিশেষ এক টান তৈরি হয়েছে। ইয়ং সং সং আমাকে সম্মান দেয়, যত্ন করে—এই জিনিসটাই আমাকে তার প্রতি বিশ্বাসী করেছে।”
ইয়ং সং সং-এর ক্ষেত্রেও অনুভূতি একই ছিল। ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তবে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন—“সত্যিকারের ভালোবাসা হলে দূরত্ব কোনো বাধা নয়।”
দীর্ঘ যাত্রা, স্মরণীয় আগমন
গত ৪ আগস্ট চীনের জিয়াংসু থেকে বিমানে করে বাংলাদেশে আসেন ইয়ং সং সং। রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানোর পর তিনি সরাসরি রওনা হন দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে। অবশেষে ১০ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি পৌঁছান সুরভীর গ্রামে।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামজুড়ে কৌতূহল দেখা দেয়। শত শত মানুষ ভিড় জমায় শুধু এক নজর দেখতে সেই চীনা যুবককে, যিনি প্রেমের টানে হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছেন। স্থানীয় এক যুবক বলেন,
“এমন ঘটনা আমাদের এখানে খুবই বিরল। বিদেশি কেউ এভাবে গ্রামে এসে বিয়ে করবে—এটা ভাবাই যায় না।”
পরিবারের প্রেক্ষাপট
সুরভী স্থানীয় অটোচালক নুর হোসেন বাবু ও গৃহিণী সাথী আক্তারের ছোট মেয়ে। দুই বোনের মধ্যে তিনি ছোট হওয়ায় পরিবারের সবার স্নেহ বেশি পেয়েছেন। ইয়ং সং সং পেশায় একজন নির্মাণ প্রকৌশলী। তার বাবা ইউয়ান সিকি প্রয়াত, মা লিউ ফেনহং বর্তমানে চীনে বসবাস করছেন।
সুরভীর মা সাথী আক্তার জানান,
“প্রথমে অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু মেয়ের সুখের কথা ভেবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি কাগজপত্র যাচাই করে সব ঠিক থাকলে বিয়ে দেব।”
কাগজপত্র যাচাই ও বিয়ের প্রস্তুতি
বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবারের পক্ষ থেকে ইয়ং সং সং-এর পাসপোর্ট, ভিসা এবং অন্যান্য পরিচয়পত্র যাচাই করা হচ্ছে। সব কিছু নিয়মমাফিক থাকলে শিগগিরই বিয়ের তারিখ ঘোষণা করা হবে। এরই মধ্যে গ্রামে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ—কেউ কেউ বলছেন, এ যেন সিনেমার গল্প।
বিয়ের জন্য স্থানীয়ভাবে কিছু প্রাথমিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। বাড়ির উঠান পরিষ্কার, আলো ঝলমল সজ্জা, আর আত্মীয়-স্বজনদের আমন্ত্রণের তোড়জোড় চলছে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া
গ্রামের প্রবীণরা এই ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, ভালোবাসা মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া ও ঐক্যের সেতুবন্ধন তৈরি করে। তবে কেউ কেউ সতর্কও করছেন, যাতে সব কিছু আইনগতভাবে এবং নিরাপদে সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন,
“ভালোবাসা সুন্দর বিষয়, তবে আইনি ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো মেনে চলা জরুরি। এতে করে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।”
ভালোবাসার জয়
এই সম্পর্ক স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা ও উৎসাহের জন্ম দিয়েছে। অনেক তরুণ-তরুণী তাদের গল্পকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দুই-ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই কাহিনিতে।
ইয়ং সং সং বলেন,
“আমি চীন থেকে শুধু ভালোবাসার জন্য এসেছি। সুরভী আমার জীবনসঙ্গী হবে—এই বিশ্বাস নিয়েই এখানে এসেছি। আমি চাই, আমরা সুখী পরিবার গড়তে পারি।”
প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের ঘটনা নতুন নয়, তবে গ্রামীণ পরিবেশে এ ধরনের আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক বেশ বিরল। এই ধরনের সম্পর্ক শুধু দুই ব্যক্তির জীবনকেই প্রভাবিত করে না, বরং দুই দেশের সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে।
স্থানীয়রা আশা করছেন, সব কিছু ঠিক থাকলে এ বিয়ে শুধু ভালোবাসার নয়, সংস্কৃতির মেলবন্ধনেরও প্রতীক হয়ে থাকবে।

0 Comments